শুক্র. মে ২৯, ২০২০

স্তালিনের সাজানো বিচার থেকে ট্রাম্পের অভিশংসন

যুক্তরাষ্ট্রকে সারা বিশ্ব আদিতম গণতান্ত্রিক দেশ বলে জানে। আদিবাসী আমেরিকানদের নির্বিচারে হত্যা করা, ট্রান্স–আটলান্টিক দাস কেনাবেচার সেই সংস্কৃতি থেকে আমেরিকা বেরিয়ে আসতে পেরেছে। একই সঙ্গে এটিও সত্যি, এই আমেরিকায় ১৯৬৫ সালের আগে বেশির ভাগ কৃষ্ণাঙ্গের ভোটাধিকার ছিল না। ১৯২০ সালের আগে নারীদের ভোটাধিকার ছিল না।

সেই যুক্তরাষ্ট্রে এখন মজবুত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। দেশটির আইনসভা ও বিচার বিভাগ এতটাই মজবুত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে যে প্রয়োজনে তারা খোদ প্রেসিডেন্টকে পর্যন্ত অভিশংসিত করতে পারে। এমনকি তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করতে পারে।

সর্বশেষ ট্রাম্পের অভিশংসনের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের জোরালো গণতন্ত্র দেখল বিশ্ব। তবে সবাই বুঝল, একটি সাজানো বিচারের নাটকের মধ্য দিয়ে ট্রাম্পকে চূড়ান্তভাবে অব্যাহতি দেওয়া হলো। গণতন্ত্রের নামে এই নাটক মঞ্চস্থ হয়ে গেল। ট্রাম্পের এই অভিশংসনের বিচার দেখে যে কারও ১৯৩০–এর দশকের ‘মস্কো ট্রায়াল’–এর কথা মনে পড়ে যেতে পারে। ওই সময় সোভিয়েত ইউনিয়নে জোসেফ স্তালিন তাঁর প্রতিপক্ষ ট্রটোস্কির অনুগতদের সাজা দেওয়ার জন্য পাতানো বিচার শুরু করেছিলেন। যাঁদের ধরা হচ্ছিল তাঁদের বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ ছিল, তাঁরা সোভিয়েত ইউনিয়নে পুনরায় পুঁজিবাদ প্রতিষ্ঠার চক্রান্তে লিপ্ত। সেই পাতানো বিচারে অভিযুক্তদের দোষী সাব্যস্ত করার রায় আগেই ঠিক করা হয়েছিল। আর এখন প্রতিনিধি পরিষদে অভিশংসিত ট্রাম্পকে যে সিনেটের সালিসিতে নির্দোষ ঘোষণা করা হবে, তা–ও আগে থেকেই ঠিক করা ছিল।

ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে, তিনি ইউক্রেনের সরকারকে চাপ দিয়েছিলেন, যাতে তারা তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বার্নি স্যান্ডার্সের বিরুদ্ধে তদন্ত করে। ট্রাম্পের বিরুদ্ধে আনা এই অভিশংসন প্রস্তাব প্রতিনিধি পরিষদে পাস হয় এবং ট্রাম্পকে সিনেটে বিচারের সম্মুখীন হতে হয়।

একটি বিচার তখনই নিরপেক্ষ ও যথার্থ হয়, যখন বিচারকেরা সিদ্ধান্ত নেন আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় তাঁরা আপস করবেন না; কিন্তু সিনেটের প্রভাবশালী জুরিরা বিচার শুরুর আগেই প্রকাশ্যে ঘোষণা দিলেন—তাঁরা নিরপেক্ষ নন, তাঁরা প্রেসিডেন্টের পক্ষে।

সিনেটে মেজরিটি লিডার মিচ ম্যাককনেল বললেন, ‘আমি ভণিতা করব না। আমি খোলাখুলি বলছি, আমি প্রেসিডেন্টকে দায়মুক্ত করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।’

স্তালিন যাঁদের বিচারক নিয়োগ করেছিলেন, তাঁরা এতটা খোলাখুলিভাবে তাঁর পক্ষে কথা বলতেন না। সেই দিক বিবেচনা করলে ট্রাম্পের উচিত এই বিচারকদের পুরস্কৃত করা।

ইরানে পাহেলভি শাসন ও বর্তমান ইসলামিক শাসন—উভয় আমলেই লোকদেখানো বিচার বসিয়ে বহু দোষী ব্যক্তিকে নির্দোষ বানানো হয়েছে। বহু নির্দোষ ব্যক্তিকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে।

মিসরে হোসনি মোবারক এবং মোহাম্মদ মুরসি একই ধরনের বিচারের মুখে পড়েছেন।

সর্বশেষ সৌদি আরবের সাংবাদিক জামাল খাসোগির হত্যার বিচার হয়েছে। এই বিচারের মধ্য দিয়ে মূল সন্দেহভাজন মোহাম্মাদ বিন সালমানকে দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে।

ঠিক একইভাবে এই বিচারের মধ্য দিয়ে ট্রাম্পকে নির্দোষ ঘোষণা করা হয়েছে। এতে শেষ পর্যন্ত ট্রাম্পেরই লাভ হয়েছে। এই বিচারের মধ্য দিয়ে তাঁর আগামী নির্বাচনে জনপ্রিয়তা বাড়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।

আল–জাজিরা থেকে নেওয়া।

হামিদ দাবাশি আল–জাজিরার নিয়মিত কলাম লেখক

Developed by - Web Nest Ltd.

Helpline - +88 01719305766