বাংলাদেশ

বঙ্গবন্ধুকে বাঁচাতেই বাবা শহীদ হন, এ বীরত্ব গর্বের : কঙ্কা

বঙ্গবন্ধু হচ্ছেন বাংলাদেশ আর বাংলাদেশ মানেই বঙ্গবন্ধু। সেই বঙ্গবন্ধুকে বাঁচাতে গিয়ে শহীদ হয়েছেন আমার বাবা। বাবাকে হত্যা করার পর তার লাশটিও ঘাতকরা আমাদের দেখতে দিতে চায়নি।

এক পর্যায়ে বিশেষ শর্ত বেঁধে দেয়া হয়, লাশ দেখে কাঁদা যাবে না। আমাদের দিকে রাইফেল তাক করে রেখেছিল ঘাতক সেনা সদস্যরা। তাক করা রাইফেলের সামনেও আমার বড় বোন, আম্মা আর আমি কাঁদছিলাম।

আমার বড় বোন যখন আর্তনাদ শুরু করলেন তখন সেনারা উত্তেজিত হয়ে উঠলেন। মাথায় রাইফেল তাক করে বলল, ‘স্টপ, কাঁদলেই শ্যুট করে দেব’। আপু তখনও কাঁদছিলেন। পরে কেউ একজন আপুকে বাসার ভেতরে নিয়ে যায়। আমার বাবা বঙ্গবন্ধুকে বাঁচাতে গিয়ে শাহাদাতবরণ করেছেন, বাবার এ বীরত্ব আমাদের কাছে সবচেয়ে গর্বের।- শোক ও ভীতিকর সেই পরিস্থিতির বর্ণনা দিতে গিয়ে শহীদ কর্নেল জামিল আহমেদের দ্বিতীয় মেয়ে আফরোজা জামিল কঙ্কা বারবার কেঁদে উঠছিলেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট একদল ঘাতক সেনাদের হাত থেকে বঙ্গবন্ধুকে বাঁচাতে শাহাদাতবরণ করেন কর্নেল জামিল।

১৪ আগস্ট মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর মহাখালীর ডিওএইচএসের বাসায় যুগান্তরের এ প্রতিবেদকের সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় কঙ্কা জানান, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরের দিকে বাবা-মায়ের উচ্চস্বরের কথাবার্তায় আমার এবং বড় বোন তাহমিনা এনায়েত তুন’র ঘুম ভেঙে যায়। গণভবনেই আমাদের বাসা ছিল। মা-বাবার শয়নকক্ষের পাশেই ছিল আমাদের থাকার রুমটি।

ঘুম থেকে উঠে দেখি মা-বাবা বিচলিত, অস্থির হয়ে উঠছেন। পরে জেনেছি, বঙ্গবন্ধু ফোন করেছেন, তিনি বিপদে আছেন। লাল ফোনটা বেজে উঠতেই মা ফোনটা ধরলেন, ওপাশ থেকে বঙ্গবন্ধু বলছিলেন, ‘এই জামিল কই? জামিলকে তাড়াতাড়ি দে।’ মা দ্রুত ফোনটি বাবাকে দিলেন, বাবা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কথা বলে ফোনটি রেখেই উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠেন। বললেন, বঙ্গবন্ধুর বাসায় হামলা হয়েছে।

ওই সময় বাবা দ্রুত সেনাপ্রধানসহ একাধিক পদস্থ কর্মকর্তাকে বিষয়টি জানান। ওই সময়ের সেনাপ্রধান কেএম সফিউল্লাহ ফোর্স পাঠাবেন বলে বাবাকে আশ্বস্ত করেছিলেন। এরপর দ্রুত তৈরি হয়ে সিভিল পোশাকেই বঙ্গবন্ধুর বাসভবনের দিকে ছুটে চলেন। মায়ের প্রতি বাবার শেষ কথা ছিল, তুমি আমার মেয়েদের খেয়াল রেখ। আমি বঙ্গবন্ধুকে বাঁচাতে যাচ্ছি। কথাগুলো বলতে বলতে দু’চোখ জলে ভরে উঠছিল কঙ্কার।

কঙ্কা বললেন, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু যে সোনার দেশ চেয়েছিলেন, সোনার মানুষ চেয়েছিলেন তা আজও কি আমরা পেয়েছি? নতুন প্রজন্ম কি আমার বাবার আত্মদানের কথা জানে। পাঠ্যপুস্তকে কি আমার বাবার বীরত্বের কথা লেখা আছে?

আমি শুধু বলতে চাই, গত ১০ বছরে শিক্ষামন্ত্রী নাহিদ সাহেব (নুরুল ইসলাম নাহিদ) কী করেছেন? কিংবা প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রীই বা কী করলেন? প্রথম শ্রেণী থেকে পঞ্চম শ্রেণী, ৬ষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত বাংলাদেশ-বাংলাদেশের ইতিহাস ও আমার বীর বাবাকে নিয়ে সহজভাবে বিশদ কোনো লেখা আছে? এইচএসসি এবং সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কি বাবার ইতিহাস পড়ানো হয়? কেন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু, চার নেতা, বাবাদের মতো বীরদের পূর্ণাঙ্গ একটি সাবজেক্ট (বিষয়) নেই।

কঙ্কা বললেন, আমরা কখনও বাবার জন্য দোয়া করি না। বাবা মহান একজন নেতার জন্য, যে নেতা না হলে বাংলাদেশ হতো না, সেই নেতার জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন, শাহাদাতবরণ করেছেন। আল্লাহ বাবাকে বেহেশত দান করবেন, এটাই নিশ্চিত। শহীদের মর্যাদা আল্লাহর কাছে সবচেয়ে উঁচুতে। ক্ষোভ প্রকাশ করে বললেন, বাবার একটি মিউজিয়াম নেই। বাবার স্মৃতিগুলো আঁকড়ে ধরে আছি।

বাবার স্মৃতিগুলো নিয়ে একটি ‘শহীদ কর্নেল জামিল আহমেদ কর্নার’ করার জন্য আর্মি মিউজিয়ামও এগিয়ে আসছে না। এবার আপাকে (প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা) বলব, বাবার ব্যবহৃত স্মৃতিগুলো যেন বঙ্গবন্ধু মিউজিয়ামে রাখার ব্যবস্থা করেন।

ওখানে যেন একটি কর্নার করেন। রাজনীতি নিয়ে শঙ্কায় আছেন জানিয়ে কঙ্কা বললেন, সেনা আর দেশবিরোধী শাসকদের দিয়ে কখনও একটি দেশ ভালোভাবে চলতে পারে না। আওয়ামী লীগ মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীনতার পক্ষের দল। এ দলটি হোঁচট খেলে স্বাধীনতাবিরোধী এবং ’৭৫-এর ঘাতকরা সক্রিয় হয়ে উঠবে।

’৭৫-এর সেই নির্মম অধ্যায়ের প্রত্যক্ষদর্শী কঙ্কার বয়স তখন ১২ বছর। তার চেয়ে তিন বছরের বড় ছিলেন তনু। কঙ্কার ছোট্ট যে বোনটি তার নাম ফাহমিদা আহমেদ শ্বেতা। ১৫ আগস্টের মাসখানেক পর কর্নেল জামিলের স্ত্রী আনজুমান আরা বুঝতে পারেন তিনি সন্তানসম্ভবা।

স্বামীর মৃত্যুর আট মাস পর জন্ম নেয় তাদের কনিষ্ঠ কন্যা কারিশমা জামিল। কঙ্কা জানালেন, বাবার শহীদ হওয়ার মধ্য দিয়ে বহু স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে যায়। আমি ছোটবেলা থেকেই ভালো ছবি আঁকতাম। বাবার পিঠ ছিল আমার ছবি আঁকার প্রথম ক্যানভাস।

চিত্রকলা নিয়ে পড়াশোনা করতে তাকে প্যারিসে পাঠানোর কথা ছিল। বড় বোনকে ডাক্তারি পড়াবেন, এমন স্বপ্ন ছিল বাবার। আমাদের ৪ বোনকে নিয়ে আম্মা (আনজুমান আরা) খেয়ে না-খেয়ে জীবন কাটিয়েছিলেন। আমরা সুইডেনসহ কয়েকটি দেশে রাজনৈতিক আশ্রয়ের প্রস্তাব পেয়েছিলাম। কিন্তু আম্মার সাফ কথা ছিল, যে মাটিতে তার স্বামী সমাহিত রয়েছেন সেই মাটি ছেড়ে তিনি কোথাও যাবেন না।

বাবাকে নিয়ে একটি স্মারক গ্রন্থ সম্পাদনা করেছেন কঙ্কা। স্মারক গ্রন্থটি নিয়ে যুগান্তরকে বললেন, বাবাকে নিয়ে পাঠ্যপুস্তকে তেমন কিছু লেখা নেই। গত ৪ বছর ধরে এ গ্রন্থটি নিয়ে কাজ করছি। বাবাকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করা অনেক লেখা ইতিমধ্যে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে।

এখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ আরও বেশ কয়েকজনের লেখা, স্মৃতিচারণ সংগ্রহ বাকি রয়েছে। আগামী একুশে ফেব্রুয়ারি বইমেলায় স্মারক গ্রন্থটি প্রকাশ করার ইচ্ছা রয়েছে। এছাড়া বঙ্গবন্ধু ও বাবাকে নিয়ে ৪৯টি চিত্রাঙ্কন করেছি। চিত্রাঙ্কনগুলো দিয়ে একটি প্রদর্শনী করব। প্রদর্শনীটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দিয়ে উদ্বোধন করাতে চাই।

কঙ্কা জানান, ১৯৭৩ সালে বাবা আমাদের নিয়ে পাকিস্তান থেকে দেশে ফেরার সুযোগ পান। এয়ারপোর্টে বাবা জানতে পারেন, তাকে বঙ্গবন্ধু দেখা করতে বলেছেন। বাবা আমাদেরকে বাসায় চলে যেতে বলেন। এরপর সোজা চলে যান ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে।

সেখান থেকে বাসায় ফিরে বাবা জানান, বঙ্গবন্ধু বাবাকে তার সঙ্গে থাকতে বলেছেন। তিনি বাবাকে সিকিউরিটি কমান্ড্যান্ট হিসেবে নিয়োগ দেন। পরে বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রপতি হলে বাবাকে সামরিক সচিব করেন। বঙ্গবন্ধু বাবাকে অনেক বিশ্বাস করতেন। আদর করতেন। ভালোবাসতেন। বঙ্গবন্ধুর সেই বিশ্বাস আর আস্থার প্রতি সম্মান জানাতেই বাবা তার জন্য জীবন দিয়েছেন। এটা আমাদের জীবনে সবচেয়ে গর্বের বিষয়।

Jugantor

Show More
W3 Techniques

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close